১.উপক্রমণিকাশৈশবের কথা আমার খুবই মনে পড়ে। কিন্তু বলার মত তেমন কিছু সেখানে নেই আমার। নেহায়েত অনাকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়াতে বড়দের আদর পেতাম না তেমন। বোরিং বাচ্চাদের কোলে নিতে চায় না কেউ :(
বাল্যকালটাও আমার একঘেয়ে এবং একই বিরক্তিকর সুরে পেরিয়ে যাচ্ছিল, তবে একটা ব্যাপার ছাড়া। পড়াশোনায় বেশ ভাল হয়ে উঠেছিলাম আমি। ক্লাসে ফার্স্ট হতাম এবং গর্বিত একজন 'Nerd' হিসেবে সুপরিচিত হয়ে উঠছিলাম। আমার প্রতিদিনকার জীবনের বর্ণনাটা ক্লাসের বইতে আদর্শ ছাত্রীর যে বর্ণনা থাকত তারই উনিশ-বিশ হবে।পড়াশোনার বাইরে অন্য কিছু খুব সামান্যই গুরুত্ব পেত আমার কাছে। কিন্তু এতসবের পরেও আমার একটা সার্বক্ষণিক সহচর ছিল- আমার ঠিক পিঠাপিঠি ছোট বোনটা। ওর ব্যক্তিত্ব ছিল আমার উল্টো। পার্থিব বিষয়গুলোর প্রতি তার ভেতরে এক ধরনের অবজ্ঞা কাজ করত। কিংবা উদাসীনতাও বলা চলে। ক্লাস ভর্তি ছেলেমেয়ে যখন ক্লাসওয়ার্ক করে জমা দেওয়ার জন্য মরীয়া হয়ে উঠেছে, সে তখন টিচার বা ক্লাস কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে বিড় বিড় করে কথা বলতে বলতে কোনো বয়স্ক প্রফেসর বা বিজ্ঞানীর মত পেছনে হাত বেঁধে ক্লাসের এমাথা থেকে ওমাথা টহল দিচ্ছে! ছোটবেলা থেকেই তার ভিতরে জ্ঞানী-গুণী মহামানবী(!) হয়ে ওঠার সমস্ত লক্ষণ পরিস্ফূট হয়ে উঠছিল। ক্লাসের পড়ার ব্যাপারে সে তেমন মনোযোগী ছিল না। যখন যা মনে ধরত, তাই পড়ত সে এবং প্রতিভার জোরে ভালোও করে ফেলত।
ছবি আঁকতে ভালবাসত সে। আমিও বাসতাম। আমরা দুই বোন বসে বসে অনেক বিকাল গ্রামের দৃশ্য কিংবা ডিজনীর বিভিন্ন কার্টুন এঁকে পার করেছি। তবে আরেকটা ব্যাপার ছিল ওর। ও লেখালেখি করত ঐ বয়সেই। যতদূর মনে পড়ে ক্লাস ওয়ান বা টুতে থাকতে ওর লেখা একটা গল্প প্রকাশিত হয়েছিল একটা ম্যাগাজিনে। এই লেখালেখি ব্যাপারটা আমি তখনো চেষ্টা করে দেখিনি। এত গায়েও লাগাতাম না। ভাবখানা- আমার আঁকা হাম্পটি ডাম্পটি মানবের ছবিও তো ম্যাগাজিনে গেছে! কী আর এমন! তবু উৎসাহের বশে একবার একটা গল্প লিখে ফেললাম। প্রেমকাহিনী ছিল সেটা- আর এই নিষিদ্ধ(!) গল্প একমাত্র আমার সেই বোনকেই পড়তে দিয়েছিলাম। সে বেশি একটা প্রশংসা করল না। গল্পটা যে ভাল হয়নি তা আমিও বুঝতে পারছিলাম।
যাই হোক, আমি মনোযোগ দিয়ে ক্লাসের পড়া আর আমার আঁকাআঁকি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। এর মধ্যে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। খেয়াল করলাম আমার বোন একা একা কী যেন লিখছে একটা ডায়েরিতে। আমি তো অবাক। ডায়েরি তো ক্লাসের পড়া টুকে আনার জন্যে। এটাতে ঘরে বসে কী লিখছে ও! দেখতে চাইলে সে দিল না দেখতে। আমার আগ্রহ তখনি বেড়ে একশোগুণে পরিণত হল- গোপন কথা! প্রেম-ভালবাসা কিংবা অশ্লীল কিছু! ঠিক করলাম, কী আছে- দেখতেই হবে... লুকিয়ে একদিন পড়লাম তার ডায়েরি। পড়ে তো আমি বিমোহিত- সেখানে দিনলিপি লিখেছে সে! জাগতিক-মহাজাগতিক এবং আদর্শিক বিভিন্ন বিষয়ে তার সুচিন্তিত মতামতও ব্যক্ত করা হয়েছে! তবে আমার মনে গেঁথে গেল শেষ লাইনটা- ''সব মিলিয়ে দিনটি বেশ আনন্দেই কাটল।''
২. ক্যারিয়ারের শুরু
আমার তো স্কুলের ডায়েরি ছাড়া আর ডায়েরি ছিল না। তাছাড়া ক্লাসের ডায়েরিতে ব্যক্তিগত গোপন কথা লেখাটা যুক্তিযুক্ত মনে হল না। আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে পড়লে তারা হাসাহাসি করবে। বুদ্ধি বের করে ফেললাম। আমার বাংলা খাতা থেকে কতগুলো পৃষ্ঠা নিয়ে কেটে কুটে একটু লম্বাটে শেইপের একটা নোটবুক বানিয়ে ফেললাম। কেটেকুটে কিছু বানানোতে আমার বিশেষ পারদর্শিতা ছিল আগে থেকেই। নিজের প্রতিভা কাজে লাগাতে পেরে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠলাম আমি।
সবই তো হল। ডায়েরি লেখার পালা এবারে। রাতে ঘুমুতে যাবার আগে ডায়েরি লেখার নিয়ম। আমি শুরু করলাম। ভোর ছটায় ঘুম থেকে উঠেছি। এরপর হোমওয়ার্ক... সব শেষ করে ভাবলাম এবারে কী লেখা যায়? ওহ ঐ কথাটা লিখতে হবে... আমি লিখলাম-সব মিলিয়ে দিনটি বেশ আনন্দেই কাটল :D এরপর প্রতিরাতেই ডায়েরি লেখা চলত। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই আমি আবিষ্কার করলাম। আমার ডায়েরিতে মোটামুটি একই কথা লেখা থাকে। আমার প্রায় এক সপ্তাহের ডায়েরির কী ওয়ার্ডস নিলে এরকম হবে: ''ভোর ছটায় ঘুম থেকে উঠেছি। এরপর হোমওয়ার্ক... - বাংলা-ইংরেজি ... ...ক্লাস- সমাজ- বিজ্ঞান-ধর্ম... ....হোমওয়ার্ক- ক্লাসওয়ার্ক- ক্লাসটেস্ট- বুকওয়ার্ক... একঘণ্টা খেলা... পড়া- খাওয়া। এবং যথারীতি সেই লাইন: সব মিলিয়ে দিনটি বেশ আনন্দেই কাটল। "
এই সাতদিনেও আমার মাথা থেকে কোন মহাজাগতিক তত্ত্বের উদয় হল না। জীবন ও জগতের প্রতি ঘৃণা ধরে গেল আমার। নিজের প্রতিভাহীনতার গ্লানিতে মুষড়ে পড়লাম আমি। আর সত্যি কথা বলতে কী, বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সুতরাং, ওখানেই ইতি টানলাম আমার স্বল্পদৈর্ঘ্য ডায়েরি ক্যারিয়ারের।
৩. দ্বিতীয় ইনিংস
পাঁচ বছর পরের ঘটনা। ক্লাস নাইনে উঠেছি মাত্র। বয়ঃপ্রাপ্তিতে নিজের মনোদৈহিক পরিবর্তনের সাথে সাথে পারিপার্শ্বিকতার পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিলাম প্রথম। পুরনো আজে বাজে দু এক টুকরো ঘটনার সাথে নতুন একটা ঘটনা তৈরি হল। আমার দুবছরের বড় মামাতো ভাই আমাকে প্রেম নিবেদন করল। বলা বাহুল্য, সে ছিল সুদর্শন কিন্তু লেখাপড়ায় খুবই কাঁচা। আমার চোখে: একটি টসটসে 'মাকাল ফল'! কারণ, ভাল স্টুডেন্ট না হলে কাউকে পাত্তাই দিতাম না আমি! ঘটনাটা মাকে বলে দিলাম। ও আমাকে ভালবাসি বলেছে এবং আমার হাত ধরেছে। মা তো রেগে আগুন- আমার মেয়ের হাত ধরে! এতবড় সাহস!! আমাদের বাসায় ওর প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু একটা কথা আমি মাকে বলিনি- সে আমাকে কিস করার চেষ্টা করেছিল! ব্যাপারটার তাৎপর্য বা গুরুত্ব তখন বুঝিনি। কিন্তু একটু তো বড় হয়েছি ততদিনে। তাই কথাটা গোপন রাখলাম। পরে মনে হলো এটা ডায়েরিতে লেখা উচিত। যেমনই হোক- জীবনে প্রথম তো :P
এবারে আমার ডায়েরিতে অনেক কথা এল- তার মাঝে জীবন ও যৌবন সম্পর্কিত চিন্তাভাবনাও ছিল। ডায়েরি লেখা চলতে লাগল... বেশ কিছুদিন পার হল এবং কিছু কিছু বিষয়ে আমার জ্ঞানের মাত্রাও এলিমেন্টারি থেকে হাই স্কুলে গিয়ে পৌঁছল। একদিন ডায়েরি খুলে কী মনে করে পড়ছিলাম পুরনো লেখাগুলো। এবং কী বলব... সেই বীভৎস উৎকট প্রেম নিবেদনের বর্ণনা পড়ে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঘেন্নায় রি রি করতে লাগল। আর চিন্তা করলাম এটা কারো হাতে না পড়া ভাল। চিন্তাটা দুশ্চিন্তায় রূপ নিতে বেশিক্ষণ লাগল না। আর সুযোগ বুঝে একদিন পুড়িয়ে ফেললাম ডায়েরিটা। ঠিক করলাম আর লিখব না।
৪. আবার ঘটনা: তৃতীয় অধ্যায়
কলেজ লাইফটা পেরিয়ে গেল ঝড়ের মত। নিশ্বাস ফেলার জন্য যখন থেমেছি, দেখলাম বুয়েটে অ্যাডমিটেড হয়ে বসে আছি আমি। টুকটাক লিখতাম কিন্তু এগোচ্ছিল না। আবার ঠিক তাও না। একজনের প্রতি ভাল লাগা- হওয়া- না হওয়া কথা এইসব লিখতে চাইতাম। কিন্তু ঘরভর্তি স্পাইগুলোর ভয়ে পারছিলাম না। একটা সাংকেতিক বর্ণমালা আবিষ্কার করলাম। এর পেছনে প্রায় তিনদিন খাটতে হল। তারপর লেখা শুরু করলাম। কিন্তু ইংরেজিতে লিখে ভাল লাগছিল না। এক পৃষ্ঠা লিখতে আমার কয়েক ঘণ্টা লাগল আর ভীষণ ক্লান্তিকরও ছিল কাজটা। বুঝে গেলাম- এভাবে লিখে শান্তি পাব না। ভাবলাম কয়েকদিন বোরিং স্টাইলে লিখি। আমার উৎসাহী ভাইবোনেরা পড়তে চাইলে দিয়ে দিলাম পড়তে। কারণ, আমার তো কোনো 'সিক্রেট' নেই! ওরা খানিক পড়ে খুবই বিরক্ত হল- ঠিক আমাদের English For Today বই এর করিম কিংবা সালমা'র ডায়েরি। বুঝলাম কাজ হয়েছে। ডায়েরি আর ঘাঁটাবেনা কেউ। হলও তাই। আমার ডায়েরি টেবিলে পড়ে থাকলেও কেউ ধরে না। এমনকি সাধলেও পড়তে চায়না। এবারে মনের কথা লিখলাম প্রাণ খুলে...
একদিন দুপুরে, ভাইয়ার ঘরে গিয়ে বসলাম। ভাইয়া বাসার বাইরে তখন। আপনমনে গুনগুন করছিলাম। হঠাৎই টেবিলে রাখা ডায়েরিতে চোখ পড়ল। পড়তে শুরু করলাম। ভাইয়ার লেখার অদ্ভুত একটা ভঙ্গিমা ছিল। প্রথমে এই সময়ের কথা। তারপর শৈশবের কথা। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়লাম এক নিঃশ্বাসে। এরপর থেকে প্রায়ই ভাইয়ার ডায়েরি পড়তাম। স্টাইলটা কপিও করলাম কিছুদিন। কিন্তু কিছুদিনই। আর ভালো লাগে না কপি করতে। কারণ, নিজের জীবনটা ততদিনে ঘটনার ঘনঘটায় অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠেছে! কিন্তু কোন কিছুর এক্সট্রীমকে ভয় পেতাম আমি... আবারও সেই Feeling of Insecurity... আবারও পুড়িয়ে ফেলা। আমার ভালোলাগা- ভালোবাসার সব কথা ডায়েরির সাথেই পুড়ে মৃত্যুবরণ করল।
৫. চ্যাপ্টার ফোর: ট্র্যাজেডি
ব্লগে লেখা লেখি শুরু করেছি বছর তিনেক। মনের কথা সরাসরি না হলেও বলা তো যায় একরকম। এতেই তৃপ্ত থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হোস্টেলে থাকা শুরু করলাম এর মাঝে। আমার রুমমেটরা প্রায় থাকতই না। সুতরাং, পেয়ে গেলাম দুর্লভ নিজের পিসির সাথে আরও দুর্লভ প্রাইভেসি! কাগজে লেখার অভ্যাস চলে গেছে বহুদিন। কম্পিউটারেই লেখা শুরু করলাম ডায়েরি। কেউ ওঁৎ পেতে নেই পড়ার জন্য। কেউ নেই হাসার জন্য। আর সেই সাথে আছে নিজের ভেতর পর্যন্ত ডুব দিয়ে দেখার অবাধ সুযোগ। মাঝে মাঝেই লেখা হত... একথা ওকথা... আমার মনের দর্পণ হয়ে উঠছিল ডায়েরির সফট ভার্সন। কাজ করতে ভাল না লাগলে নিজের ডায়েরি স্ক্রল করে যেতাম। সময় কেটে যেত দুঃখবিলাস আর স্বপ্নচারণে...
বছর দুই কেটে গেল। কাজের জন্যেই একবার ফরম্যাট দিতে হল সি ড্রাইভটা। এই কাজটা করতে করতে ততদিনে এত এক্সপার্ট এবং বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিলাম যে কোন গুরুত্বই দেইনি। রাত দুটার সময় ঝিমুতে ঝিমুতে ফরম্যাট দিলাম। খুব শিগগির হয়ে গেল। রিবুটের সময় কেমন যেন উল্টাপাল্টা লাগছিল। পাত্তা দিলাম না। ওপেন করার পর আবিষ্কার করলাম আমি ডি ড্রাইভে ইনস্টল করেছি উইন্ডোজ। এবং ওখানেই ছিল আমার গত চার বছরের সমস্ত ফোটো, আমার সব লেখালেখি আর আমার ডায়েরি। মাথা ঘুরছিল। চোখে অন্ধকার দেখলাম। কী করলাম আমি এটা! হায় হায়!
ধাক্কটা খানিক পর একটু সামলে উঠে হঠাৎ মনে হলো আমার এই ডায়েরিতে যত কষ্টের স্মৃতি জমা হয়েছে- ওগুলো মুছে যাওয়াই ভাল। হয়তো নতুন করে শুরু করতে হবে আমাকে- তারই ইঙ্গিত এটা। তা নাহলে এমন অপ্রত্যাশিত অস্বাভাবিক ভুল হবে কেন আমার! মাথায় এইসব নানারকম দার্শনিক তত্ত্বের উদয় হওয়াতে আমি আবার ড্রাইভটা ফুল ফরম্যাট করে আবার সি তে উইন্ডোজ ইন্সটল করে ঘুমুতে গেলাম। কোন এক প্রোগ্রামার বন্ধু শুনে বলে- রিট্রীভ করা যাবে তো! আমি শুনে বললাম, থাক; ডায়েরি আমার জন্যে না! আড়ালে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা সে শোনেনি ঠিকই, তবে আঁচ করেছিল নিশ্চয়ই...
বি. দ্র. : গতকাল বাসায় গিয়েছিলাম। আমার হবু প্রোগ্রামার ছোটোভাইয়ের পেটমোটা ডায়েরী দেখে এইসব ঘটনা তোলপাড় করে ওঠে স্মৃতিতে। লেখাটার জন্যে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা। তবে আমার ট্র্যাজেডি শুনে সে যে হাসতে হাসতে খুন হয়েছে তা বলাই বাহুল্য; সাথে নতুন করে শুরু করার ফ্রি উপদেশও মিলেছে!